নিজস্ব প্রতিবেদক :
চলতি মাস সহ ৫, ৭,১০ মাস ধরে বেতন নেই রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর কর্মচারীদের। বকেয়া বেতন পরিশোধ, সৈয়দপুর কারখানায় ১০৯ জন শ্রমিক ছাটাইয়ের দাবিতে ঈদের আগেই কর্মবিরতি সহ কঠোর আন্দোলনের পথে বাংলাদেশ রেলওয়ের অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিকেরা। ট্রেন চলাচল হতে পারে বিঘ্ন। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ট্রেনে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে সংশয়।
গত কয়েক বছরের ন্যায় একই দাবীতে ডিসেম্বর থেকে সোচ্চার রেলওয়ে টিএলআর শ্রমিকেরা। রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সিদ্ধান্তে ঢাকা সহ রেলওয়ের চার ডিভিশনের বিভাগীয় ম্যানেজার (ডিআরএম) অফিসে এ কর্মসূচি পালিত হয়। রেলওয়েতে টিএলআর খাতে কোনও বাজেট ও মঞ্জুরি বরাদ্দ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমস্যা দেখিয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন দফতরে পোর্টার, গেইটকিপার (ট্রাফিক/ইঞ্জিনিয়ারিং), খালাসী, ওয়েম্যান, অফিস সহকারী, ওয়েটিং রুম (বেয়ারার) কেয়ারটেকার, সহ অন্যান্য পদে দীর্ঘদিন কর্মরত অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিকদের বেতন এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে ৫ মাস, ৮ মাস পর্যন্ত। বেতন কবে নাগাদ প্রদান করা হবে এ নিয়ে প্রশাসনকে বারবার তাগাদা দিলেও কর্তৃপক্ষ কোনও সমাধান দিতে পারছে না। এতে করে রমজানে কর্মচারীদের পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। আসছে পবিত্র ঈদে কিভাবে ঈদের আনন্দ ভাগ করবেন পরিবারে মুখে খাবার কোথায় হতে দিবেন তা নিয়েই হতাশা পড়েছেন রেলওয়ে কর্মরত টিএলআর কর্মচারীরা। গেইট কিপার রফিকুল ইসলাম বলেন ৫ মাস ধরে বেতন নেই। সেহেরীতে ভাত জোগাড় করতেই অনেক কষ্ট হচ্ছে। ইফতারে পানি খেয়ে ডিউটি করেছি কয়েকদিন। আমাদের এমন কষ্ট কবে দুর হবে আল্লাহ ভালো জানেন। চাকুরী স্থায়ী হবে সেই আশায় এখনো আছি।
সরকারি নিয়োগ মানে দীর্ঘসূত্রতা। জনবল সংকট সামাল দিতে তাই টেম্পোরারি লেবার রিক্রুটমেন্ট (টিএলআর) পদ্ধতিতে অস্থায়ী কর্মচারী দিয়ে দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল শুরুর লগ্ন থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বর্তমানে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে (কাজ নেই, মজুরি নেই বা কানামনা পদ্ধতি) রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ পরিবহনসেবা সংস্থাটির বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করছেন প্রায় সাত হাজার অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিক।
এর মধ্যে ২০২০ সালের ২২ নভেম্বরের রেলওয়ে নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করে। সে অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় পদগুলোয় সরাসরি বা পদোন্নতির মাধ্যমে লোকবল নিয়োগের কথা। আর অন্যান্য পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নেয়ার কথা বলা রয়েছে। সর্বশেষ রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে মাঝে কিছু সময় ৫% কমিশনে আউটসোর্সিং নিয়োগ হলেও বর্তমানে এই পদ্ধতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় রেলওয়ে। টিএলআর কর্মী বাদ দিয়ে আউটসোর্সিং চালুর প্রক্রিয়া শুরু করায় নিয়োগবিধি লঙ্ঘন ছাড়াও রেলের জরুরি সেবা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়।
রেলওয়ে নিয়োগবিধি ২০২০ অনুযায়ী, পি-ম্যান (পয়েন্টস ম্যান), গেটম্যান বা গেটকিপার, পোর্টার, খালাসি, ওয়েম্যান, ক্যারেজ খালাসি পদগুলো অত্যাবশ্যকীয়। এগুলোয় সরাসরি কিংবা পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে।
রেলওয়ে আইন ও শ্রম আইনের নিয়মে এরই মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি টিএলআর কর্মী উচ্চ আদালতে মামলার মাধ্যমে রেলওয়েতে স্থায়ী চাকরির নির্দেশনা পেয়েছেন। তবে কোনো ধরনের আইনের তোয়াক্কা না করে রেলওয়ে প্রশাসন সেই টিএলআর কর্মীদের স্থায়ী করতে রাজি হচ্ছে না। এক দশকের বেশি সময় কাজ করার পরও স্থায়ী পদে যুক্ত হতে না পেরে আন্দোলন, কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের দিকে সম্মিলিতভাবে এগোচ্ছে টিএলআর শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর শ্রমিক সংগঠন গুলো।
ঢাকা বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতা মোঃ ফেরদৌস বলেন, ‘টিএলআর কর্মীরা একটি নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী হওয়ার আশায় অন্যান্য চাকরি বা ভবিষ্যৎ কর্মজীবন বাদ দিয়ে রেলওয়েতে কাজ করেছেন। কিন্তু শ্রম আইন, রেলওয়ের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই রেলওয়ে প্রশাসন টিএলআরদের বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রায়কেও উপেক্ষা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।’
টিএলআর কর্মীরা রেলের এসব অন্যায় কার্যক্রম প্রতিহত করা ও উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে বৃহৎ আন্দোলন কর্মসূচিতে যাবেন।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে অস্থায়ী টিএলআর কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর মূখ্য সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা শ্রমিক নেতা মোঃ হোসেন বলেন; আমি দীর্ঘ ৮ বছর রেলওয়েতে অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে গেইট কিপারে কাজ করেছি। আমার মতো এমন সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত হাজারের কাছাকাছি। সরকারি গেজেট অনুযায়ী ৩ বছর পর চাকুরী স্থায়ী করার কথা। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সরকারি গেজেট মানছেন না। তাহলে তারা মানেন কি?
বিগত দিনে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিকের চাকুরী আদালতের রায়ের মাধ্যমে হয়েছে। আদালত শ্রমিকের পক্ষে রায় দিচ্ছেন মানবিকতা, সরকারি ৩-১২-২০০৩ তারিখের গেজেট ও রেলওয়ে আইন অনুযায়ী। যে সরকারি গেজেট মানছেন না রেলওয়ে সেই গেজেট আমলে নিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে রায় দিচ্ছেন মহামান্য আদালত।
পাকশী বিভাগের শ্রমিক প্রতিনিধি মোহাম্মদ লিখন বলেনঃ সরকারি গেজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সকল টিএলআর শ্রমিকদের চাকুরি স্থায়ী করণের লক্ষে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পশ্চিম অঞ্চলে ৯০ জন গেইট কিপারদের প্রাথমিকভাবে কমিটির মাধ্যমে যাছাই বাছাই করে। কমিটি সকল কিছু যাছাই বাছাইয়ের পর চাকুরী স্থায়ী করার সুপারিশ করলেও কর্তৃপক্ষ এখনো তা বাস্তবায়ন করছে না কোন এক অদৃশ্য কারনে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে টিএলআর কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় শ্রমিক প্রতিনিধি শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ শাওন বলছেনঃ শ্রমিক প্রতিনিধিরা সরকারি গেজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাকুরী স্থায়ী করণে সকল প্রমাণ পত্র সহ রেলপথ মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। অনুলিপি জমা দেওয়া হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, রেলওয়ে মহাপরিচালক দপ্তর সহ বিভিন্ন দপ্তরে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে অস্থায়ী কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাওন আরও বলেন; আমরা বারবার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আসি তাদের সাথে বসতে চাই, আলোচনার টেবিলে সরকারি গেজেট বাস্তবায়ন করে শ্রমিকদের চাকুরী স্থায়ী করতে চাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় কর্তৃপক্ষ আমাদের কোন বিষয় সমাধান করতেই চায় না কোন অজানা কারনে তা জানা নেই! আবার শ্রমিকেরা আন্দোলন করলে আশ্বাস দেয় কিন্তু সমাধান আসে না। আন্দোলন করলাম যৌক্তিক দাবীতে পেটের দায়ে। অথচ অন্যায় ভাবে আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য শ্রমিকদের নামে, বেনামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। যা ১৮৮৬ সালে আমেরিকার সিকাগো ট্র্যাজেডিকে মনে করিয়ে দেয়।আন্তর্জাতিক লেবার অরগানাইজেশানে চিঠি দিয়েছি। সম্প্রতি সময়ে রমজানের চলতি ৫ মাসের বকেয়া বেতনের বোঁঝা মাথায় নিয়ে টিএলআর কর্মচারীদের পরিবার চলাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। আসছে ঈদ। বেতন হবে কিনা নেই কোন নিশ্চয়তা। গত প্রতিটি রমজান ও ঈদে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে পারছেনা কর্তৃপক্ষ। তাই এবার বেতন নিয়ে সোচ্চার রেলওয়ে টিএলআর শ্রমিকেরা। অপরদিকে সৈয়দপুর কারখানায় গত ১০ বছরের কর্মরত দক্ষ ১০৯ জন টিএলআর শ্রমিককে ছাটাই করেছে অন্যায় ভাবে বাজেট মঞ্জুরীর অযুহাতে। কিন্তু নতুন লোকও নিয়েছে অস্থায়ী ভাবে। আমরা এসবের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দ্রুত সময়ে রমজানের মধ্যে বেতন পরিশোধ সহ সৈয়দপুর কারখানায় ছাঁটাই করা ১০৯ জনকে পূর্ণবহাল করতে হবে। নয়তো ১৭ মার্চ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে রেলওয়ে টিএলআর শ্রমিকগন।
আমরা মাননীয় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মহোদয়ের কাছে আর্জি আমাদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, সৈয়দপুর কারখানায় ১০৯ জনকে পূর্ণবহাল সহ সরকারি গেজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাকুরী স্থায়ী করণ। আদালতের রায় বাস্তবায়ন করে শ্রমিকদের মাঝে একটু সুখ ফিরিয়ে দিবেন। অল্প সময়ের মধ্যে সকল টিএলআর শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবী জানান এই শ্রমিক নেতা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রেলের নিম্ন গ্রেডের স্থায়ী কর্মীদের দিয়ে টিএলআরদের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করলেও সেটি রেলের বৃহৎ কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করতে পারবে না বলে মনে করছেন খোদ রেলকর্মীরাও।