ইমরান বিন অহেদ:
প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি বা তৈরীর পিছনে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। তৈরিকৃত বস্তুটি যখন তার উদ্দেশ্য পূরণে সার্থক হয়। তখন বস্তুটি স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে একটা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হয়। আসমান-জমিনসহ এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সব কিছুই আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। তবে তার মধ্যে মানুষ এবং জিন জাতিকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য পালনার্থে সৃষ্টি করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “আমি মানুষ এবং জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করার জন্য”। (সুরা-যারিয়াত: ৫৬) সময়ের ঘুর্ণিপাকে মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন হয়। একসময় মানুষ ভুলে যায় তার সৃষ্টির আসল রহস্য। ফলে ব্যর্থ হয় তার উদ্দেশ্য পূরণে। অতঃপর সময়ে সময়ে পর্যায়ক্রমে আল্লাহ তা’আলা পথপ্রদর্শক হিসেবে নবী-রাসুল প্রেরণ করেন। যাদের কাজ ছিল, আল্লাহ তায়ালার হুকুম-আহকাম বর্ণনা করা। শিরক,বিদআত থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা। সর্বোপরি সাধারণ পথভোলা বান্দাদেরকে আপন রবের সাথে জুড়ে দেওয়া। সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য-অগণিত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। কাউকে নির্দিষ্ট কোন গোত্রের জন্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আবার কাউকে কোন অঞ্চলের জন্য প্রেরণ করেছেন। আবার কাউকে কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সর্বশেষ আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. কে। তবে নবী মুহাম্মদ সা. কে নির্দিষ্ট কোন গোত্র, অঞ্চল বা সময়ের জন্য প্রেরণ করেননি। বরং, তাঁকে সমগ্র জগতের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অর্থাৎ, নবী মুহাম্মদ সা. এরপরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন শরিয়াত বা নতুন নবীর আগমন ঘটবে না। আর এই বিষয়টি পবিত্র কোরআন ও হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
খতমে নবুওয়াত পরিচিতি
খতমে নবুওয়াত এর শাব্দিক বিশ্লেষণ:
তাফসিরে রুহুল মা’আনীতে বলা হয়েছে, “ খাতম” বা “ খাতিম” বলা হয় ঐ যন্ত্রকে যার মাধ্যমে সমাপ্তি সাধন করা হয়। এ হিসেবে পবিত্র কোরআনের শব্দ “ খাতিমুন নাবিয়্যিন” অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যার মাধ্যমে নবীর ধারার সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে এবং তাঁর পরে কোন নবী ও নেই।
ইমাম রাগেব ইস্পাহানী রহ. বলেন, তাঁকে এজন্য খাতিমে নবুওয়াত বলা হয়, কেননা তিনি আগমন করে নবুওয়াতের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন।
এডওয়ার্ড উইলিয়ামলেন “খাতিমুন নাবিয়্যিন” এর অর্থ করেছেন The last of the Prophet অর্থাৎ পয়গম্বরদের সর্বশেষ।
খতমে নবুওয়াত এর পারিভাষিক বিশ্লেষণ:
ইসলামের পরিভাষায় হযরত মুহাম্মদ সা. এর আগমনের মাধ্যমে নবুয়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে আল্লাহ তা’আলা নবুয়াত ও রিসালাতের যে পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন, তাকেই খতমে নবুওয়াত বলা হয়।
পবিত্র কুরআনের ভাষায় খতমে নবুওয়াত
নবী মুহাম্মদ সা. কে সর্বশেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করা ইসলামের মৌলিক আক্বীদাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের উপর পরিসমাপ্ত করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম”। ( সুরা- মায়েদা :৩)
অতঃপর আল্লাহ তাআলা দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার পর ঘোষণা করেন, “আমি উপদেশবাণী অবতীর্ণ করেছি এবং আমি এর সংরক্ষক”। (সুরা-হিজর : ৯)
যেহেতু, দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা নেয়ামত ও পরিসমাপ্তি করলেন। সাথে সাথে কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীন ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব ও আল্লাহ তাআলা নিজ কাঁধে নিলেন। অতএব, এখন আর নবী-রাসূলের আগমনের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না। এজন্য সুস্পষ্ট ভাষায় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “ মুহাম্মদ সা. তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি হলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল ও সর্বশেষ নবী।”( সুরা-আহযাব : ৪০)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা একথা বোধগম্য হয় যে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ সা .এর মাধ্যমে তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। আর যেহেতু দ্বীন পরিপূর্ণ সুতরাং আর কোন নবী রাসূলের প্রয়োজন থাকে না।
হাদিসের ভাষায় খতমে নবুওয়াত
মুহাম্মদ সা. সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী। আর সূর্য প্রতিম এ বিষয়টি অসংখ্য সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত মুহাম্মদ সা. ইরশাদ করেন, “আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হলো এই যে, এক ব্যক্তি একটি অট্টালিকা তৈরি করল এবং সে অট্টালিকাটিকে খুব সুন্দর শোভনীয় করে সজ্জিত করল। কিন্তু একটি ইটের স্থান শূন্য ছিল। তারপর লোকজন এ বাড়িতে প্রবেশ করতে লাগল এবং অবাক হয়ে বলতে লাগলো, এই ইটের স্থানটি যদি অপূর্ণাঙ্গ না থাকতো! রাসূল সা.বলেন, আমি হলাম সেই ইটের স্থান। কারণ, আমি এসেই নবীগণের সমাপ্তি টেনেছি। অন্য বর্ণনায় এসেছে- আমিই এ সর্বশেষ ইট এবং আমিই সর্বশেষ নবী।(সহীহ বুখারী শরীফ) ”। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন – “ ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে আমাকে সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো-আমার দ্বারা নবুওয়াত সমাপ্ত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা .থেকে বর্ণিত, রাসূল সা .বলেন- “নবীগণ বনী ইসরাঈলকে শাসন করতেন। যখনই কোন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন।আর আমার পরে কোন নবী নেই। কিন্তু খলিফাগন থাকবেন এবং তারা সংখ্যায় অনেক হবেন।” অপর এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন, আমি সর্বশেষ নবী। আমার পর কোন নবী নেই। ( সুনানে তিরমিজী: ২২১৯)
এভাবে অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রাসুলুল্লাহ সা. এর সর্বশেষ নবী এবং তাঁর পর কোন নবী আসবেন না ।
পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের দাওয়াত ছিল সাময়িক এবং তাঁদের শিক্ষাটা কোন জাতির জন্য ছিল সুনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাই সুনির্দিষ্টকাল শেষ হওয়ার পর দ্বীন তথা ধর্মে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের জন্য তাঁদের পরে নতুন নবীর প্রয়োজন দেখা দিত। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ সা.এর শিক্ষা ছিল পূর্ণাঙ্গ। তাঁর মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তা’আলা দ্বীনের পূর্ণতা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং আম