বিশেষ প্রতিনিধি
ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে থানা,উপজেলা, পৌরসভার কাউন্সিল ও কমিটি গঠনে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের শেষ নেই। অথচ বরাবরই ময়মনসিংহ বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সেই সাংগঠনিক শক্তি মুখ থুবড়ে পড়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের একক আধিপত্য বিস্তারে। দেশের সমৃদ্ধ রাজনৈতিক অঞ্চল গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে ময়মনসিংহে। এরমধ্যে হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, তারাকান্দা, ফুলপুর, গৌরিপুর,ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল সাতটা উপজেলা এবং পাঁচটি পৌরসভা মিলে গঠিত হয়েছে ময়মনসিংহ উত্তর বিএনপি। কিন্তু, সম্প্রীতি ময়মনসিংহ উত্তর বিএনপি’র কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দেখা যায় অগ্রহণযোগ্য অনিয়ম। কমিটিতে আহবায়ক করা হয়েছে অধ্যাপক একেএম এনায়েতুল্লাহ কালামকে যিনি রাজনীতিতে প্রায় অনেকটাই অনুপস্থিত। দলীয় কর্মসূচিতেও দেখা যায় না চোখে পড়ার মতো অংশগ্রহণ। অভিযোগ উঠেছে শুধুমাত্র বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের আস্থাভাজন লোক হওয়ার সুযোগে অনিয়মের মাধ্যমে কাজ করেন তিনি। সেক্ষেত্রে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মানতেও নারাজ এনায়েতুল্লাহ। অথচ তিনি বিভিন্নভাবে দলের সিনিয়র নেতাদের ও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ঔদ্ধত্য মূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন বিভিন্ন সময় । অভিযোগ রয়েছে, মামুন বিন আব্দুল মান্নানকে নিয়েও, যাকে ১২ নম্বর সদস্য করা হয়েছে। অথচ তিনি দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন, আন্দোলন, সংগ্রাম বা মিছিল -মিটিংয়ে কখনো দেখা যায় না তাকে । শুধু মামুন একা নয়, স্থানীয় রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত অনেককেই সদস্য বানিয়েছেন প্রিন্স। তিনি ময়মনসিংহের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের চরম ভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন । ফুলপুর তারাকান্দার সাবেক এমপি সারোয়ার, ঈশ্বরগঞ্জের সাবেক এমপি শাহীন, গৌরীপুরের সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল, নান্দাইলের সাবেক মেয়র পিকুল, হালুয়াঘাটের রুবেল সহ আরো অনেককে চরম ভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এই সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধ।
উক্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২২ সালের ১৬ ই জুন ; একই বছরের নভেম্বরে দায় সাড়া কয়েকটি উপজেলার কর্মী সভা করে তারা, কিন্তু আজ অব্দি কোন উপজেলা কমিটি দিতে পারিনি।
জানা গেছে, সাবেক দুই সাংসদ আহবায়ক প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তাদেরকে সুযোগ না দিয়ে, প্রিন্স তার কাছের লোকদের কমিটিতে জায়গা করে দিয়েছেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক স্থানীয় নেতা বলেন, বর্তমানে যাকে আহবায়ক করা হয়েছে, একে এম এনায়েত উল্লাহ কালাম, তিনি অনেক বছর ধরেই রাজনীতিতে সক্রিয় না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ভাঙ্গিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিন্স তাকে আহবায়ক করেছেন। কালাম হলেন প্রিন্সের খুব কাছের লোক। উক্ত কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছে মোতাহার হোসেন তালুকদারকে। তিনি সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সাথে সমঝোতার রাজনীতি করে চলেন এবং ব্যক্তিত্বহীন একজন রাজনীতিবিদ। গত ১৮ বছরে মাত্র দুটি মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে তাও আবার প্রশাসন দিয়ে সাজানো মামলা বলে কথিত আছে। তিনি বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
হরিপুরের হাফেজ আজিজুল হক কে ৮ নাম্বার সদস্য করা হয়েছে তিনিও প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের কাছের লোক। একইভাবে এম এ কাদের ভূঁইয়া যিনি থানা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা তাকেও কমিটিতে ৩৩ নাম্বার সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। মাসুম খান ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছিলেন। তবে তিনি রাজনীতিতে কেমন একটা সক্রিয় না। আন্দোলন সংগ্রামে তাকে তেমন একটা দেখা যায় না। তাকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের একজন যুবদল নেতাকে জেলা কমিটিতে রাখা হয়েছে অথচ জেলা পর্যায়ের অনেক সিনিয়র নেতাকে জেলা কমিটিতে রাখা হয়নি। এছাড়া ওসমান গনি ভূঁইয়া (গেনু) যিনি একজন ওয়ার্ড মেম্বার তাকেও জেলা কমিটির মেম্বার করা হয়েছে। শুধুমাত্র প্রিন্সের স্বীয় বলয় গড়ে তুলতে।
অন্যদিক, মামুন বিন আব্দুল মান্নান মালেশিয়া প্রবাসী। অনেক বছর ধরেই দেশে আসেন না। তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সকে একটি গাড়ি উপহার দেওয়ার বিনিময়ে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পদ পেয়েছেন।
স্থানীয় অনেক নেতারাই বলেছেন উপজেলা কমিটি ঘোষণা বিলম্বিত করা,কমিটি বাণিজ্যের একটা কৌশল। যার নেতৃত্বে আছেন প্রিন্স, কালাম আর অন্যদিকে আছে মোতাহার ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বন্ধু পরিচয়দানকারী ইয়াসের খান চৌধুরী। ইদানীং কমিটি বানিজ্য চরম আকার ধারণ করেছে। দুই গ্রুপ বিভিন্ন উপজেলায় অর্থের বিনিময়ে কমিটি দেওয়ার পায়তারা করছে। আর সেখানে জাইয়গা হচ্ছে তাদের, যারা রাজনীতির সঙ্গে জাড়িত নন,দলের সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি এই তালিকায় তারা আছেন যারা কিনা কোনদিন আন্দোলন-সংগ্রামে, মিটিং-মিছিলে কখনো উপস্থিতও হন নাই। পক্ষান্তরে পরীক্ষিত নেতাদের করা হচ্ছে অবমূল্যায়ন। অথচ দলীয় গণতন্ত্র বলেছে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে, তারপর কর্মী সভা করে কমিটি ঘোষণা করতে হবে।
কিন্তু ময়মনসিংহ উত্তর বিএনপির কমিটির ক্ষেত্রে এই ধরনের কোন নীতিমালা হয়নি।
এক কথায় বলতে গেলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিএনপির মা-বাবা হচ্ছেন এমরান সালেহ প্রিন্স। কমিটিতে স্থান পাওয়া বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যেখানে দলকে চাঙ্গা করতে আন্দোলন ও উপযোগী করে সাংগঠনিক শক্তির কথা নির্দেশনা দিচ্ছেন সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা যা শুরু করেছেন তাতে করে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না।
আমাদের বক্তব্য হলো সামনে আন্দোলন সংগ্রামকে বেগমান করতে অচিরেই জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে সত্যিকারের জিয়ার যোগ্য সৈনিকদের দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হোক।